ভোজনরসিক হিসেবে বাঙালিদের খ্যাতি জগৎজোড়া। আর সেই ভোজনবিলাসে ফরিদপুর জেলার নাম থাকবে না, তা কি হয়? পদ্মা বিধৌত এই জনপদ কেবল ইতিহাস বা রাজনীতিতেই সমৃদ্ধ নয়, এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোও জিভে জল আনার মতো। ফরিদপুরের বিখ্যাত খেজুরের গুড়, পদ্মার রুপালি ইলিশ আর শীতের পিঠা-পুলির স্বাদ ভোজনরসিকদের মনে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক ফরিদপুর জেলার বিখ্যাত কিছু খাবার সম্পর্কে।
ফরিদপুর জেলার বিখ্যাত খাবার
১. খেজুরের গুড় ও পাটালি: শীতের আসল স্বাদ
ফরিদপুরকে বলা হয় খেজুর গুড়ের দেশ। শীতকালে এই জেলার গ্রামগুলোতে খেজুর রস সংগ্রহের ধুম পড়ে যায়। বাংলা অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত গাছিরা ব্যস্ত থাকেন রস সংগ্রহে।
- বৈচিত্র্য: আগুনের উত্তাপে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের গুড়। এর মধ্যে ঝোলা গুড়, দানা গুড়, চিটা গুড় এবং বিখ্যাত নলেন গুড়ের পাটালি অন্যতম।
- স্বাদ ও ব্যবহার: এখানকার খেজুরের গুড় ও পাটালির ঘ্রাণ এবং স্বাদ অতুলনীয়। শীতকালে এই গুড় দিয়ে পায়েস, ফিরনি এবং নানারকম পিঠা তৈরি করা হয়। বিশেষ করে ‘হাজারী গুড়’ এই অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্রান্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
- অর্থনৈতিক গুরুত্ব: ফরিদপুর ও বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও বর্তমানে গাছ কাটার লোকের অভাব এবং ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছের ব্যবহারের ফলে এই ঐতিহ্য কিছুটা হুমকির মুখে, তবুও ফরিদপুরের গুড়ের চাহিদা আজও অটুট।
২. পদ্মার রুপালি ইলিশ
ফরিদপুর জেলাটি প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। আর পদ্মার ইলিশ মানেই স্বাদে ও গন্ধে সেরা। যদিও ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং বিভিন্ন নদীতেই পাওয়া যায়, কিন্তু ফরিদপুর সংলগ্ন পদ্মা নদীর অংশের ইলিশের স্বাদ ভোজনরসিকদের কাছে অমৃতসমান।
- কেন বিখ্যাত: পদ্মার পানির স্রোত এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে এখানকার ইলিশে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে, যা রান্না করার পর এক অদ্ভুত সুন্দর স্বাদ ও ঘ্রাণ তৈরি করে।
- জনপ্রিয় পদ: সর্ষে ইলিশ, ইলিশ ভাজা, ইলিশের ডিম এবং ভাপা ইলিশ এখানকার মানুষের প্রিয় খাবার। ফরিদপুরের সিএন্ডবি ঘাট বা ধলার মোড়ে তাজা ইলিশ ভাজা খাওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন।
৩. পিঠা-পুলি ও আতিথেয়তা
বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পিঠা, আর ফরিদপুরে এর কদর একটু বেশিই। শীতের সকালে খেজুরের রস আর গুড় দিয়ে তৈরি পিঠার স্বাদ ভোলা দায়।
- উৎসবের আমেজ: নতুন ধান ওঠার পর এবং পৌষ সংক্রান্তিতে ফরিদপুরের ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির উৎসব শুরু হয়। এটি কেবল খাবার নয়, বরং আত্মীয়-স্বজন ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার একটি মাধ্যম।
- জনপ্রিয় পিঠা: ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ চিতই, পুলি পিঠা, তালের পিঠা এবং নকশি পিঠা। ফরিদপুরের খেজুর গুড় ছাড়া যেন এসব পিঠার স্বাদ অপূর্ণই থেকে যায়।
৪. মালাই সর ও মিষ্টি (বিশেষ সংযোজন)
ফরিদপুরের খাবারের কথা বললে ‘মালাই সর’-এর কথা বলতেই হবে। খাঁটি দুধের ঘন মালাইয়ের পরত দিয়ে তৈরি এই খাবারটি ফরিদপুরের সিগনেচার ডিশ হিসেবে পরিচিত।
- মালাই চা: ফরিদপুরের বিভিন্ন টং দোকানে (বিশেষ করে শহরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড় ও ভাঙ্গা রাস্তার মোড়ে) মালাই দেওয়া চা পাওয়া যায়, যার স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো।
- মিষ্টি: ফরিদপুরের বাগাটের দধি এবং রসগোল্লার বেশ সুনাম রয়েছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন মিষ্টির দোকানগুলোতে ছানার তৈরি সন্দেশ ও মিষ্টি ভোজনরসিকদের প্রিয়।
খেজুরের গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ, পদ্মার ইলিশের চর্বিযুক্ত স্বাদ আর মালাই চায়ের আড্ডা—সব মিলিয়ে ফরিদপুর জেলা ভোজনরসিকদের জন্য এক আদর্শ গন্তব্য। আপনি যদি কখনো ফরিদপুরে ভ্রমণে যান, তবে এই খাবারগুলোর স্বাদ নিতে ভুলবেন না।