ফরিদপুর জেলার ইতিহাস

বাংলাদেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ফরিদপুর। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলটি রাজনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সুলতানি আমলে এই এলাকাটি ‘ফতেহাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে সুফি সাধক ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের চারণভূমি হিসেবে ফরিদপুর ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম লিখিয়েছে।

 

ফরিদপুর জেলার ইতিহাস
নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট – ফরিদপুর জেলা

 

১. নামকরণ ও প্রশাসনিক বিবর্তন

ফরিদপুর জেলার নামকরণের পেছনে রয়েছে এক আধ্যাত্মিক ইতিহাস। প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদউদ্দিন-এর নামানুসারে এই জেলার নামকরণ করা হয় ‘ফরিদপুর’।

  • ঢাকাজালালপুর থেকে ফরিদপুর: ১৭৮৬ সালে যখন এই জেলাটি প্রথম গঠিত হয়, তখন এর নাম ছিল ‘ঢাকাজালালপুর’ এবং এর সদরদপ্তর ছিল ঢাকায়। ১৮০৭ সালে সদরদপ্তর বর্তমান ফরিদপুর শহরে স্থানান্তর করা হলেও নাম পরিবর্তন হয়নি। অবশেষে ১৮৩৩ সাল থেকে এই জেলা ‘ফরিদপুর’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
  • বৃহত্তর ফরিদপুর: গোয়ালন্দ, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ—এই চারটি মহকুমা নিয়ে ফরিদপুর জেলা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। কালক্রমে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বৃহত্তর ফরিদপুর ভেঙে বর্তমানে পাঁচটি জেলায় (ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর) রূপান্তরিত হয়েছে।

 

২. ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও নীল বিদ্রোহ

ফরিদপুর ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের দূর্গ। বিশেষ করে ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ এবং ‘নীল বিদ্রোহে’ এই জেলার মানুষের অবদান অনস্বীকার্য।

  • ফরায়েজী আন্দোলন: তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমা থেকে হাজী শরীয়তুল্লাহ বিখ্যাত ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ শুরু করেন। এটি ছিল ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি শোষক জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক জাগরণ।
  • নীল বিদ্রোহ: হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দুদু মিয়া এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে দূর্গ গড়ে তোলেন। গড়াই, মধুমতি ও চন্দনা বারাশিয়া নদীর তীরে সেসময় ব্যাপক নীল চাষ হতো। জানা যায়, এই জেলায় মোট ৫২টি নীলকুঠি ছিল। এর মধ্যে আলফাডাঙ্গা উপজেলার মীরগঞ্জের নীলকুঠি ছিল প্রধান, যার ম্যানেজার ছিলেন কুখ্যাত এসি ডানলপ (A.C. Dunlop)।
  • আইনি সহায়তা তিতুমীর: নীল চাষিদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে সহায়তা করেন বাংলার মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত নবাব আবদুল লতীফ। এছাড়া মীর নিসার আলি তিতুমীর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুর অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন জনপদ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

 

৩. ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও নিদর্শন

ফরিদপুর জেলা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানকার প্রাচীন মসজিদ ও মন্দিরগুলো সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যরীতির সাক্ষ্য বহন করে। উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • প্রাচীন মসজিদ: গেরদা মসজিদ (১০১৩ হিজরি), পাথরাইল মসজিদ ও দিঘী (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.), এবং সাতৈর শাহী মসজিদ (১৫১৯ খ্রি.)।
  • মথুরাপুরের দেউল: মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত এই দেউলটি মোগল আমলের এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী।
  • অন্যান্য স্থাপনা: ফতেহাবাদ টাঁকশাল (১৫১৯-৩২ খ্রি.), ঐতিহাসিক জেলা জজ কোর্ট ভবন (১৮৯৯ খ্রি.), এবং ভাঙ্গা মুন্সেফ কোর্ট ভবন (১৮৮৯ খ্রি.)।
  • ধর্মীয় স্থান: ভাঙ্গা গোল চত্বর সংলগ্ন বসুদেব মন্দির ও শ্রীধাম জগবন্ধু আঙিনা এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক।

 

৪. আধুনিক ফরিদপুর ও পৌরসভা

বর্তমান ফরিদপুর জেলা শহরটি কুমার নদীর তীরে অবস্থিত। নগরায়নের ছোঁয়া এই জেলায় অনেক আগেই লেগেছিল। ১৮৬৯ সালে ফরিদপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভাগুলোর একটি। বর্তমানে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই জেলা শহরের আয়তন প্রায় ৬৬.২৪ বর্গ কিলোমিটার।

ফরিদপুর কেবল একটি ভৌগোলিক নাম নয়, বরং এটি হাজার বছরের বাঙালি সত্তার সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

Leave a Comment