পদ্মা বিধৌত ফরিদপুর জেলা কেবল তার সোনালী আঁশ বা রাজনীতির জন্যই নয়, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য আধার হিসেবেও পরিচিত। এখানে রয়েছে শতবছরের পুরনো মসজিদ, মঠ, মন্দির এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ফরিদপুর জেলার প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো।
ফরিদপুর জেলার দর্শনীয় স্থান

১. পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি ও কবরস্থান
ফরিদপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান হলো পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের পৈত্রিক নিবাস। কবির বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’-এ উল্লিখিত সেই ডালিম গাছ এবং তার দাদীর কবর এখানেই অবস্থিত। ছায়াঘেরা শান্ত এই পরিবেশটি দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যায়। এখানে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে একটি ছোট সংগ্রহশালাও রয়েছে।
- অবস্থান: ফরিদপুর শহরতলীর অম্বিকাপুর (গোবিন্দপুর গ্রাম), কুমার নদীর তীরে।
- কিভাবে যাবেন: ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে এর দূরত্ব মাত্র ২ কিলোমিটার। শহর থেকে রিক্সা বা অটোরিক্সায় সহজেই যাওয়া যায়।
- যোগাযোগ (তত্ত্বাবধায়ক): রাজিয়া সুলতানা (০১৯১৫-৬১০৫১), কাজী রফিক (০১৯১১-৭৫৯৪০৫)। (নম্বর পরিবর্তন হতে পারে)
২. নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট (River Research Institute)
বাংলাদেশের একমাত্র নদী গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ফরিদপুরে অবস্থিত। এর বিশাল ক্যাম্পাস, সবুজ গাছপালা এবং শান্ত পরিবেশ বিকেলের সময় কাটানোর জন্য চমৎকার। বিশেষ করে এর ভেতরের রাস্তাগুলো হাঁটার জন্য খুব উপযোগী।
- অবস্থান: ফরিদপুর শহরের হারুকান্দি এলাকা, বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের পাশে।
- কিভাবে যাবেন: ফরিদপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে। রিক্সা বা অটোতে যাওয়া যায়।
৩. শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন (জগদ্বন্ধু সুন্দরের আশ্রম)
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের এই আশ্রমটির স্থাপত্যশৈলী এবং ধর্মীয় গাম্ভীর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানে নামসংকীর্তন ও ধর্মীয় উৎসব জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়।
- অবস্থান: ফরিদপুর পুরাতন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন, গোয়ালচামট।
- কিভাবে যাবেন: শহরের যেকোনো স্থান থেকে রিক্সা বা অটোযোগে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড বা শ্রীঅঙ্গন মোড়ে যাওয়া যায়।
৪. মথুরাপুর দেউল
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে মথুরাপুর দেউল অন্যতম। এটি মোগল আমলে (আনুমানিক ১৬শ শতকে) নির্মিত একটি মঠ বা বিজয় স্তম্ভ। বারোভূঁইয়াদের সময়কার এই স্থাপনাটির গায়ে মাটির ফলকের (Terracotta) অপূর্ব কারুকাজ রয়েছে।
- অবস্থান: মধুখালী উপজেলার মথুরাপুর গ্রাম।
- কিভাবে যাবেন: ফরিদপুর থেকে বাসে মধুখালী বাজার। সেখান থেকে রিক্সা বা ভ্যানে মধুখালী-রাজবাড়ী ফিডার সড়ক ধরে দেড় কিলোমিটার উত্তরে গেলেই দেউলটি দেখা যাবে।
৫. পাতরাইল মসজিদ ও দিঘী (মজলিশ আউলিয়া মসজিদ)
সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির এক অনন্য নিদর্শন এই মসজিদ। ধারণা করা হয় ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি নির্মিত। এর পাশে একটি বিশাল দিঘী রয়েছে যা এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
- অবস্থান: ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়ন।
- কিভাবে যাবেন: ফরিদপুর থেকে বাসে ভাঙ্গা গোলচত্বর। সেখান থেকে ভাঙ্গা-মাওয়া বিশ্বরোড ধরে ৮ কি.মি. পূর্বদিকে পুলিয়া বাসস্ট্যান্ড। পুলিয়া থেকে ৪ কি.মি. দক্ষিণে গেলেই পাতরাইল মসজিদ।
৬. সাতৈর শাহী মসজিদ
ফরিদপুরের ঐতিহ্যের আরেকটি প্রতীক সাতৈর মসজিদ। লালচে রঙের এই মসজিদটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই মসজিদের পুকুরের পানি অনেক রোগের উপশম করে।
- অবস্থান: বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়ন।
- কিভাবে যাবেন: ফরিদপুর থেকে বাসে মাঝকান্দি মোড়। সেখান থেকে মাঝকান্দি-গোপালগঞ্জ মহাসড়ক ধরে কিছুটা সামনে এগোলেই সাতৈর বাজার ও মসজিদ।
৭. বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি জাদুঘর
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ-এর স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর নিজ গ্রামে একটি গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।
- অবস্থান: মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের রউফ নগর (সালামতপুর)।
- কিভাবে যাবেন: ফরিদপুর থেকে বাসে কামারখালী বাজার। সেখান থেকে মধুমতি নদীর পাড় ঘেঁষে রিক্সা বা ভ্যানে জাদুঘরে যাওয়া যায়।
এক নজরে দর্শনীয় স্থান ও যাতায়াত ব্যবস্থা
ভ্রমণপিপাসুদের সুবিধার্থে সংক্ষিপ্ত তালিকাটি নিচে দেওয়া হলো:
| দর্শনীয় স্থান | অবস্থান | যাতায়াত মাধ্যম |
| জগদ্বন্ধু সুন্দরের আশ্রম | গোয়ালচামট, ফরিদপুর সদর | পুরাতন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন, পায়ে হাঁটা পথ। |
| নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট | হারুকান্দি, ফরিদপুর | নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে ১ কি.মি., রিক্সা/অটো। |
| পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি | অম্বিকাপুর, সদর উপজেলা | শহর থেকে রিক্সা বা অটোতে ২ কি.মি.। |
| পাতরাইল মসজিদ | ভাঙ্গা উপজেলা | ভাঙ্গা মোড় > পুলিয়া > পাতরাইল (অটো/ভ্যান)। |
| মথুরাপুর দেউল | মধুখালী উপজেলা | মধুখালী বাজার থেকে ১.৫ কি.মি. উত্তরে। |
| সাতৈর মসজিদ | বোয়ালমারী উপজেলা | মাঝকান্দি থেকে বাসে সাতৈর বাজার। |
| মুন্সী আব্দুর রউফ জাদুঘর | কামারখালী, মধুখালী | কামারখালী বাজার থেকে রিক্সা/ভ্যানে। |
আবাসন টিপস:
দর্শনীয় স্থানগুলোর আশেপাশে সাধারণত ভালো মানের আবাসিক হোটেল নেই (ভাঙ্গা ও মধুখালী ছাড়া)। তাই দিনের আলোয় ভ্রমণ শেষ করে রাতে থাকার জন্য ফরিদপুর জেলা শহরে ফিরে আসাই উত্তম। শহরে থাকার জন্য হোটেল র্যাফেল ইনস, লাক্সারী বা হোটেল পদ্মা বেছে নিতে পারেন।