ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

বাংলাদেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা ফরিদপুর। পদ্মা বিধৌত এই জনপদটি শুধু ভৌগোলিক কারণেই নয়, বরং এর সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এবং কৃষি বাণিজ্যের জন্য দেশজুড়ে সুপরিচিত। “ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত”– এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন, কারণ এর খ্যাতির পরিধি অনেক বিস্তৃত।

ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত
নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট – ফরিদপুর জেলা

 

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নামকরণ

ফরিদপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদউদ্দিন-এর নামানুসারে। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ জেলা। ১৮১৫ সালে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ফরিদপুর সবসময়ই সামনের সারিতে ছিল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বিশেষ করে ‘ফরায়েজী আন্দোলন’-এর সূতিকাগার ছিল এই বৃহত্তর ফরিদপুর।

 

ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত
ধলার মোড় – ফরিদপুর জেলা

 

২. বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্মস্থান (রত্নগর্ভা ফরিদপুর)

ফরিদপুরকে বলা হয় রত্নগর্ভা জেলা। রাজনীতি, সাহিত্য এবং সমাজ সংস্কারে এই জেলার সন্তানদের অবদান অনস্বীকার্য। যদিও গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরিীয়তপুর ও রাজবাড়ী এখন আলাদা জেলা, তবুও ঐতিহাসিকভাবে এরা বৃহত্তর ফরিদপুরের অংশ ছিল। ফরিদপুরের খ্যাতির অন্যতম বড় কারণ এর কৃতী সন্তানেরা:

  • পল্লীকবি জসীমউদ্দীন: বাংলা সাহিত্যের অমর নক্ষত্র পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই ফরিদপুরেই। শহরের অদূরে অম্বিকাপুরে তাঁর পৈত্রিক নিবাস, যা বর্তমানে একটি দর্শনীয় স্থান। তাঁর কবর এবং ‘জসীম পল্লী মেলা’ ফরিদপুরের অন্যতম আকর্ষণ।
  • হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়া: ব্রিটিশ বিরোধী ফরায়েজী আন্দোলনের মহান নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার কর্মভূমি ছিল এই জেলা।
  • হুমায়ূন আহমেদ: বাংলা সাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ ফরিদপুরের কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
  • নবাব আব্দুল লতিফ: মুসলিম রেনেসাঁ বা জাগরণের অগ্রদূত এবং শিক্ষাবিদ।
  • অম্বিকা চরণ মজুমদার: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ।
  • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: বিখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পৈত্রিক ভিটাও এই মাদারীপুর (তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর) অঞ্চলে।
  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই ঐতিহাসিকভাবে ফরিদপুরের সাথে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

৩. কৃষি ও অর্থকরী ফসল (পাট ও খেজুরের গুড়)

কৃষিজাত পণ্যের জন্য ফরিদপুর সারা দেশে বিখ্যাত।

  • সোনালী আঁশ (পাট): একসময় ফরিদপুরকে বলা হতো পাটের রাজধানী। এখানকার মাটি পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশের অন্যতম সেরা মানের পাট এবং পাটজাত পণ্যের জন্য ফরিদপুর বিখ্যাত। এখনো জেলার কানাইপুর ও বোয়ালমারী পাটের বড় বাজার হিসেবে পরিচিত।
  • খেজুরের গুড়: শীতকালে ফরিদপুরের খেজুরের গুড় ও পাটালির খ্যাতি দেশজুড়ে। বিশেষ করে এই অঞ্চলের ‘নলেন গুড়’ ভোজনরসিকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
  • পেঁয়াজ ও পদ্মার ইলিশ: দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ আসে ফরিদপুর থেকে। এছাড়া পদ্মা নদী সংলগ্ন হওয়ায় এখানকার ইলিশ মাছের স্বাদ ও খ্যাতি রয়েছে।

৪. নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট (River Research Institute)

বাংলাদেশের একমাত্র নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ফরিদপুর শহরের হারুকান্দি এলাকায় অবস্থিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদী রক্ষা, ভাঙন রোধ এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার গবেষণার জন্য এটি একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর সুন্দর ক্যাম্পাস পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।

৫. দর্শনীয় স্থান ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

ফরিদপুর জেলায় বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে:

  • পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাড়ি: কবির স্মৃতিবিজড়িত ঘর, ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং বাড়ির আঙিনায় তাঁর কবরস্থান দেখতে সারা বছরই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন।
  • মথুরাপুর দেউল: মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত এই দেউলটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বারোভূঁইয়াদের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনাটি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বহন করে।
  • কানাইপুর জমিদার বাড়ি: প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়িটি শিকদার বাড়ি নামেও পরিচিত। এর স্থাপত্যশৈলী আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
  • আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল: ধর্মীয় কারণে ফরিদপুরের আটরশি দরবার শরীফ বা বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে সমবেত হন।
  • বাইশ রশি জমিদার বাড়ি: এটিও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা যা তার জৌলুস এবং ইতিহাসের জন্য বিখ্যাত।

৬. মিষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস

ফরিদপুরের মালাই সর (Malai Sar) বা মালাই চা এবং বিশেষ ধরণের মিষ্টির বেশ কদর রয়েছে। এখানকার রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ের মিষ্টি এবং শহরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী দোকানের দধি ও রসগোল্লা ভোজনরসিকদের প্রিয়।

৭. যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফরিদপুরকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলা হয়। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ফরিদপুরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটি এখন ঢাকা এবং দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার সংযোগস্থলের প্রধান কেন্দ্র। দেশের অন্যতম ব্যস্ত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট (ফরিদপুরের নিকটবর্তী রাজবাড়ী জেলায় অবস্থিত হলেও অর্থনৈতিকভাবে ফরিদপুর সংশ্লিষ্ট) এবং রেল যোগাযোগ এই জেলাকে বাণিজ্যিক হাব-এ পরিণত করেছে।

ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

পরিশেষে বলা যায়, ফরিদপুর কেবল একটি জেলা নয়, এটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার। পল্লীকবির কবিতা, সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিকতা, পাটের সোনালী ঐতিহ্য এবং খেজুর গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে ফরিদপুর বাংলাদেশের মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি এবং কৃষিতে এই জেলার অবদান বাঙালি জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

Leave a Comment