বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা ফরিদপুর। বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই জেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। জেলা সদরের টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতাল থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত বিস্তৃত এই সেবা নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।
আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ফরিদপুর জেলার স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহের ধরণ, সেবা গ্রহীতার অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ রক্ষায় গৃহীত কার্যক্রম।
জেলার প্রধান স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহ
ফরিদপুরে বেশ কিছু স্বনামধন্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা কেবল জেলাবাসীকেই নয়, বরং আশেপাশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষকে সেবা প্রদান করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (পূর্বতন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল)। ২. ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ৩. ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল (সদর হাসপাতাল)। ৪. ফরিদপুর হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। ৫. উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহ।
স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ও হাসপাতালে প্রাপ্য সেবাসমূহ
তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা হাসপাতালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেবা গ্রহীতারা এখান থেকে যে সকল সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সাধারণ চিকিৎসা ও পরামর্শ: স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রে আগত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, যুবক ও শিশু—সকলকেই প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। আগত রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে যেকোনো প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন।
২. মা ও শিশু স্বাস্থ্য:
- হাসপাতালে আগত প্রসূতি মায়েদের নিয়মিত চেকআপ (Antenatal Checkup) এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।
- গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা রোধে আয়রন ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়।
- মাতৃসদন ও শিশু মঙ্গল কেন্দ্র স্থাপন এবং ধাত্রীদের (Midwife) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
৩. টিকাদান কর্মসূচি (EPI): শিশু ও মহিলাদের মরণঘাতী রোগ থেকে রক্ষার জন্য ইপিআই (EPI) কার্যক্রমের আওতায় নিয়মিত প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়।
৪. সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ:
- ডায়রিয়া রোগীদের জন্য খাওয়ার স্যালাইন (ORS) সরবরাহ করা হয়।
- জাতীয় যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের আওতায় সন্দেহভাজন রোগীদের কফ পরীক্ষা করা হয় এবং আক্রান্তদের বিনামূল্যে ঔষধ সরবরাহ করা হয়।
- ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে বিশেষ প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়।
৫. প্রজনন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগত কিশোর-কিশোরী এবং সক্ষম দম্পতিদের প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে শিক্ষা ও পরামর্শ দেওয়া হয়।
৬. ঔষধ সরবরাহ: সরবরাহ সাপেক্ষে সেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ঔষধ প্রদান করা হয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা স্টক না থাকলে রোগীকে বাইরে থেকে ঔষধ ক্রয় করতে হতে পারে।
৭. রেফারেল সিস্টেম: জটিল রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়।
নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট – ফরিদপুর জেলা
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনসচেতনতা
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়:
- নোটিশ বোর্ড: উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে দৃশ্যমান স্থানে নোটিশ বোর্ড স্থাপন করা থাকে।
- তথ্য প্রদর্শন: বোর্ডে মজুদ ঔষধের তালিকা, প্রদানকৃত সেবাসমূহের বিবরণ এবং সেবা প্রদানকারী চিকিৎসকদের তালিকা টানানো থাকে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই তথ্য পেতে পারেন।
জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়ন
কেবল চিকিৎসা দেওয়াই নয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রশাসনিকভাবেও নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে:
- প্রাথমিক ও ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা: প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দিতে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক দল (Mobile Medical Team) গঠন করা হয়।
- চিকিৎসা শিক্ষা ও অনুদান: চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সাহায্যদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে অর্থ মঞ্জুরী প্রদান করা হয়। কম্পাউন্ডার, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়।
- বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি: ইউনানী, আয়ুর্বেদীয় ও হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারী প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও উৎসাহিত করা হয়।
প্রাণিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্য (Veterinary Public Health)
জনস্বাস্থ্যের সাথে প্রাণিসম্পদের স্বাস্থ্যও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই জেলা পরিষদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় গবাদি পশু ও পাখির সুরক্ষায়ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়:
ধলার মোড় – ফরিদপুর জেলা
- রোগ প্রতিরোধ: গবাদি পশু ও পাখির সংক্রামক ব্যাধি দূরীকরণ এবং ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
- খামার স্থাপন ও দুগ্ধ উৎপাদন: গবাদি পশুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন এবং দুগ্ধপল্লী বা ডেইরি ফার্ম স্থাপনে উৎসাহ প্রদান। দুগ্ধ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসম্মত লালন-পালনের ব্যবস্থা করা।
- চারণভূমি ও সংরক্ষণ: গবাদি পশু সম্পদ সংরক্ষণ এবং তাদের জন্য চারণভূমির উন্নয়ন করা।
ফরিদপুর জেলার এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।